ট্রেনের চাকা ঘোরে নারীর সাহসিকতায়: ফরিদা আক্তারের গল্প
ট্রেনের ছন্দময় গতি ছুটে চলে গন্তব্যের দিকে। আর সেই গতির পেছনে আছেন এক সংগ্রামী নারী—ফরিদা আক্তার। সকল প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে, ট্রেন চালকের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করছেন তিনি। তার সাহসিকতা আর আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ শুধু রেল বিভাগের কর্মকর্তারাই নন, সাধারণ যাত্রীরাও। লালমনিরহাট রেল স্টেশনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন তিনি।
চার সন্তানের মা ফরিদা আক্তার জীবনের প্রয়োজনেই বেছে নিয়েছেন ট্রেন চালানোর মতো চ্যালেঞ্জিং একটি পেশা। প্রথমদিকে কিছুটা ভয় পেলেও এখন এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ছুটে চলা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রেল বিভাগে কাজ শুরু করেন তিনি। শুরু থেকেই তার দৃঢ় ইচ্ছা ছিল প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে জয় করার।
ফরিদা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই চ্যালেঞ্জিং কিছু করার ইচ্ছে ছিল। রেলের এএলএম (অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকোমাস্টার) গ্রেড-টু একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, বিশেষ করে নারীদের জন্য। কিন্তু পরিবার যদি সহযোগিতা করে, তাহলে মেয়েরাও এই চ্যালেঞ্জ নিতে পারে। আমি নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছি, ব্যর্থতা আমার জন্য নয়।”
নারী হওয়ার কারণে তাকে প্রতিনিয়ত অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তবে কখনো দমে যাননি তিনি। এমনকি ট্রেনের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি হলে নিজেই তা সমাধান করার সাহস দেখান। তার সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বে মুগ্ধ রেল কর্তৃপক্ষ।
ফরিদা বলেন, “অন ডিউটি করার সময় আমি সবসময় মনে রাখি, আমার দায়িত্বে অনেক যাত্রীর নিরাপত্তা জড়িত। তাদের সুরক্ষিতভাবে গন্তব্যে পৌঁছানোই আমার প্রথম কাজ। কে কী বলল, তা আমার দেখার বিষয় নয়। আমি শুধু আমার কাজেই মনোযোগী থাকি।”
পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া এ পেশায় আসা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ফরিদা। তার চার সন্তান—দুই মেয়ে ও দুই ছেলে—জেনে গেছেন, তাদের মা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করেন। সন্তানদের মানসিকতা ইতিবাচক হওয়ায় তার পেশাগত দায়িত্ব পালন আরও সহজ হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, রেল স্টেশনে নারী চালকদের জন্য আলাদা হোল্ডিং এরিয়া না থাকায় কিছুটা অসুবিধা হয়।
ফরিদার এই যাত্রা শুধু তার নিজের নয়; এটি দেশের নারীদের জন্য এক বড় উদাহরণ। তার উদ্যম নতুন প্রজন্মের নারীদের জন্য প্রেরণার উৎস। এক যাত্রী বলেন, “ট্রেনে যাতায়াত করার সময় দেখি, নারী ট্রেন চালাচ্ছেন। এটা দেখে আমরা খুব অনুপ্রাণিত হই। নারী হয়েও ছেলেদের মতো কাজ করছেন—এটা আমাদের জন্য গর্বের।”
রেল বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, “নারীরা এখন আর ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। ফরিদার মতো নারীরা দেখিয়ে দিচ্ছেন, কোনো পেশাই নারীদের জন্য অসম্ভব নয়। সাহস, অধ্যাবসায় আর আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিটি বাধা জয় করা সম্ভব।”
ফরিদা আক্তারের সাহসিকতার গল্প গোটা দেশের নারীদের জন্য এক নতুন পথচলার প্রতীক। তার মতো নারীরা প্রমাণ করছেন যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রতিটি সাফল্য অর্জন সম্ভব।
0 Comments